চিকিৎসকের কলমে, সুস্থতার সন্ধানে আমাদের চিকিৎসক প্রতিকার সম্পর্কে

বিষয়, লেখার শিরোনাম অথবা চিকিৎসকের নাম

লেখাটি সহজ বাংলায় লিখুন, তথ্যের সূত্র উল্লেখ করুন এবং রোগীর ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রাখুন।

লেখা জমা দেওয়ার নিয়ম ও ফর্ম
খাবার ও পুষ্টি

করোনা ও ডেঙ্গু একসঙ্গে আক্রান্ত হলে করণীয়

Protikar২৫ জুন ২০২৫ · ৪ মিনিট পড়া
করোনা ও ডেঙ্গু একসঙ্গে আক্রান্ত হলে করণীয়

গত কিছু বছর করোনাভাইরাস এবং ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাব আমাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। যদিও করোনা অতিমারির তীব্রতা কিছুটা কমেছে, তবে ভাইরাসের নতুন ধরন নিয়ে এখনও সতর্ক থাকতে হয়। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবও বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী সময়ে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে এই সময়ে যদি কেউ একসঙ্গে করোনা এবং ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাহলে তা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করে। তাই এই দুই ধরনের ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়ে সজাগ থাকা অপরিহার্য।

একজন চিকিৎসক বলেন, যখন কোনো রোগী একই সময়ে করোনা ও ডেঙ্গু উভয় ভাইরাসে সংক্রমিত হয়, তখন তার শারীরিক অবস্থার জটিলতা বেড়ে যায়। এই ধরনের রোগীর প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়া জরুরি। সাধারণত এই অবস্থায় রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া নিরাপদ হয়। সুতরাং দুই ধরনের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে সচেতন থাকা এবং প্রাথমিক উপসর্গ ধরা পড়লেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

একসঙ্গে করোনা ও ডেঙ্গুর সংক্রমণে রোগীর উপসর্গ সাধারণ জ্বরের থেকে অনেক বেশি তীব্র হতে পারে। কখনো জ্বরের মাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হতে পারে এবং তা দীর্ঘদিন ধরে থাকতে পারে, এমনকি দুই সপ্তাহেরও বেশি সময়। এই সময় মাথাব্যথা, গলাব্যথা, পেশি ও গিঁটে ব্যথা, বুকে চাপ অনুভূতি, শ্বাসকষ্ট, কাশি, ক্ষুধামন্দা, বমিভাব, বমি, শরীরের দুর্বলতা এবং ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। শ্বাসের হার বেড়ে যাওয়া এবং ঘুমের সমস্যা অনেক সময় লক্ষণ হিসেবে প্রকাশ পায়। পাশাপাশি, করোনার এবং ডেঙ্গু জ্বরের স্বতন্ত্র উপসর্গও একই সময়ে উপস্থিত থাকে।

দ্বৈত সংক্রমণের কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অত্যন্ত চাপের মুখে পড়ে। এটি একটি তীব্র ‘যুদ্ধ’ যেখানে রোগ প্রতিরোধকারী কোষগুলো জীবাণুদের সঙ্গে লড়ে থাকে। কিন্তু একাধিক ভাইরাসের সংক্রমণে এই লড়াই কঠিন ও জটিল হয়। এর ফলে রোগীর রক্তে শ্বেত রক্তকণিকার পরিমাণ হ্রাস পায় এবং শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন ফুসফুস, কিডনি, হৃদয়, লিভার এবং মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রোগীর শরীরে রক্তক্ষরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, বুকে বা পেটে পানি জমতে পারে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে, রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে এবং হার্টের স্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এসব অবস্থাকে ‘শক’ বলা হয়, যা সময়মতো চিকিৎসা না নিলে প্রাণঘাতী হতে পারে।

বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু সংক্রমণের জটিলতা বেশি থাকে এবং প্রাণনাশের আশঙ্কাও থাকে। যদিও করোনায় শিশুদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম, দ্বৈত সংক্রমণে শিশুদের ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি প্রবল হয়। বয়োজ্যেষ্ঠ এবং স্থূল ব্যক্তিরাও এই অবস্থায় বেশি ঝুঁকির সম্মুখীন হন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অ্যাজমা, হৃদরোগসহ দীর্ঘমেয়াদি যেকোনো রোগে আক্রান্ত রোগীর দ্বৈত সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রেও একই সংক্রমণ শিশুর ক্ষতির কারণ হতে পারে।

দ্বৈত সংক্রমণের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করতে হবে। জ্বরের সময়ে পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করা আবশ্যক। রোগীর শরীর ও মাথা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে এবং গোসল করানো ভালো, তবে গোসলের পানিতে সামান্য গরম পানি মিশিয়ে নিতে পারেন যাতে স্বস্তি পাওয়া যায়। জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে অন্য কোনো ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যাদের রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন অ্যাসপিরিন, ক্লপিডগ্রেল, ওয়ারফেরিন) সেবন করে থাকেন, তাদের অবশ্যই চিকিৎসককে এ বিষয়ে জানাতে হবে। করোনা আক্রান্ত হলে আলাদা ঘরে থাকা উচিত এবং সর্বদা মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

করোনা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল ব্যক্তিগত সতর্কতাই যথেষ্ট নয়, সামাজিক সচেতনতা জরুরি। মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা এবং কফ-থুতু ফেলা থেকে বিরত থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার বংশ বিস্তার রোধে আশপাশের জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশন করতে হবে। বিশেষ করে শহুরে এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের পানি ও গাছপালার টবের জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন ঘটে, যা প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগ এবং সবার সমন্বিত সচেতনতা প্রয়োজন।

সুতরাং, এই দুই রোগের ঝুঁকি ও জটিলতা মোকাবেলায় নিজের এবং পরিবারের স্বাস্থ্য রক্ষায় সতর্ক থাকা সবচেয়ে জরুরি। কোনও ধরনের উপসর্গ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না। স্বাস্থ্য সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করাই জীবন বাঁচাতে পারে।

এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *