বিড়াল নয়, ডিপথেরিয়ার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া
মানুষের ঘরে প্রাণী পোষার ইতিহাস বহু প্রাচীন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। কুকুর, বিড়াল, পাখি, মাছসহ নানান প্রাণী এখন ঘরের সঙ্গী। যদিও প্রাণী পোষার বিরোধীতায়ও একটি মত রয়েছে, বিশেষ করে যারা মনে করেন, প্রকৃতির প্রাণীকে গৃহে বন্দী রাখা ঠিক নয়। এ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও, এক বিষয়ে সবাই একমত—প্রাণীকে যত্ন ও নিরাপদ পরিবেশে রাখা উচিত।
তবে প্রাণী পোষা নিয়ে সমাজে নানা রকম ধারণাও প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে অনেকটাই বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন। এর মধ্যে একটি হল—বিড়ালের পশম মুখে গেলে ডিপথেরিয়া হতে পারে। এই ধারণা কতটা সঠিক, তা জানার আগে ডিপথেরিয়া সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা জরুরি।
ডিপথেরিয়া একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ, যা নাক, গলা ও শ্বাসনালিতে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে। এই রোগের জন্য দায়ী করনিব্যাকটেরিয়াম ডিপথেরি নামের একটি ব্যাকটেরিয়া, যা বিষাক্ত টক্সিন তৈরি করে। এই টক্সিন গলায় একটি সাদা-ধূসর আস্তরণ সৃষ্টি করতে পারে, যা শ্বাস নিতে সমস্যা তৈরি করে। রোগের জটিলতা বাড়লে এই টক্সিন রক্তে মিশে হৃৎপিণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রান্ত করতে পারে। এমনকি চোখ, ত্বক ও দেহের অন্য অংশেও ছড়াতে পারে এই জীবাণু।
ডিপথেরিয়ার উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে সর্দি, জ্বর, গলা ব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া, কথা বলতে ও গিলতে কষ্ট হওয়া, মুখে ও গলায় ধূসর আস্তরণ তৈরি হওয়া এবং শ্বাসকষ্ট। শিশুদের ক্ষেত্রে মুখ দিয়ে লালা ঝরা, লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া এবং গলায় ঘা হওয়ার মতো উপসর্গও দেখা যেতে পারে।
এই রোগ সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। এছাড়া ব্যবহৃত জামাকাপড়, বাসনপত্র, বিছানাও জীবাণুবাহক হতে পারে। সংক্রমণ ঠেকাতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা করে রাখতে হয়। ত্বকের ক্ষত দিয়েও এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করতে পারে, তবে এটি তুলনামূলকভাবে বিরল।
ডিপথেরিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং সহজ একটি টিকার মাধ্যমে। দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা দেওয়া হয়, যার মধ্যে ডিপথেরিয়ার প্রতিষেধক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি শিশুর ষষ্ঠ, দশম ও চতুর্দশ সপ্তাহে দেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
সবশেষে, বিড়াল বা তার পশমের সঙ্গে ডিপথেরিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। বিড়াল ডিপথেরিয়ার জীবাণু বহন করে না এবং তার মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায় না। তাই ভুল ধারণায় বিভ্রান্ত হয়ে শিশুদের প্রাণীর সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা উচিত নয়। বরং পোষা প্রাণী শিশুর মধ্যে সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ এবং ভালোবাসার গুণাবলি গড়ে তুলতে পারে। একঘেয়ে নগরজীবনে এসব প্রাণী শিশুদের জন্য হতে পারে আনন্দ ও মানবিকতার অন্যতম উৎস।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

Leave a Reply