যুক্তরাষ্ট্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব: ভরসার নাম ‘থেরাবট’
যুক্তরাষ্ট্রের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। ডার্টমাউথ কলেজের একদল গবেষকের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের মাধ্যমে মানসিক সমস্যার নিরাময়ে কার্যকরভাবে সাহায্য করা সম্ভব, যদি এর পেছনে বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি থাকে।
এই গবেষক দলের তৈরি অ্যাপ্লিকেশন ‘থেরাবট’ বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের সংকট মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। এক সহকারী অধ্যাপক জানান, বর্তমান মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এতটাই প্রকট যে, বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা দশগুণ বাড়ানো হলেও প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। তাই সময় এসেছে একেবারেই নতুন কিছু করার।
গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও খাওয়ার সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ‘থেরাবট’ কার্যকরভাবে কাজ করছে। বর্তমানে প্রচলিত থেরাপির সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য উদ্ভাবন পরিচালক মন্তব্য করেছেন, ভবিষ্যতে এমন সময় আসছে, যেখানে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত ও বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় নির্মিত এআই থেরাপিস্ট আমাদের পাশে থাকবে। তবে তিনি শিশু ও কিশোরদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে কিছু উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন।
প্রায় ছয় বছর ধরে থেরাবট উন্নয়নে কাজ করছেন ডার্টমাউথের গবেষক দল। প্রকল্পের একজন সহ-নেতা সতর্ক করে বলেছেন, মুনাফার পেছনে ছুটে যদি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তাহলে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে। সে কারণে তারা এ উদ্যোগকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার কথাও ভাবছেন, যাতে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতরাও সাশ্রয়ী ডিজিটাল থেরাপির সুবিধা পেতে পারেন।
বর্তমানে বাজারে প্রচলিত অনেক মানসিক স্বাস্থ্য অ্যাপ শুধুই লাভের জন্য তৈরি এবং এগুলো সাধারণত ব্যবহারকারীর মনোরঞ্জনে গুরুত্ব দেয়, বাস্তব ভিত্তি থাকে দুর্বল। এর ফলে অনেক তরুণ ব্যবহারকারী প্রতারণার শিকার হন।
এই প্রেক্ষাপটে ‘থেরাবট’ আলাদা জায়গা করে নিচ্ছে। এটি কেবল প্রচলিত থেরাপির অনুকরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিজস্ব কৃত্রিম রোগী-চিকিৎসক কথোপকথনের মডেল তৈরি করে সুরক্ষা নিশ্চিত করছে।
তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) এই ধরনের এআই অ্যাপ্লিকেশনকে ‘চিকিৎসা যন্ত্র’ হিসেবে সরাসরি অনুমোদন দেয়নি। তারা কেবল নির্দিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে বাজারজাতকরণের অনুমতি দিচ্ছে।
অন্যদিকে, ‘ইয়ারকিক’ নামের এক স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ‘পান্ডা’ নামে একটি নিরাপদ এআই থেরাপিস্ট তৈরি করেছে, যা সংকটময় পরিস্থিতি ও আত্মহত্যাপ্রবণ আচরণ শনাক্ত করে সহায়তার সংকেত দিতে পারে।
তাদের মতে, গভীর রাতে যখন একজন মানুষ থেরাপিস্টকে ফোন দিতে পারে না, তখন এই চ্যাটবট সবসময়ই অনলাইনে থাকে এবং সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকে।
একজন ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, ট্রমা ও মানসিক চাপের সময় তিনি চ্যাটজিপিটি নামক একটি জনপ্রিয় এআই চ্যাটবটকে সহায়ক হিসেবে পেয়েছেন। যদিও এটি মূলত মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য তৈরি নয়, তবে তার মতে এটি উদ্বেগ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি উদ্বেগে ভোগা অন্যদের এটি ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছেন।
এই সব উদ্যোগ ইঙ্গিত দেয়, প্রযুক্তি আর মানুষের সম্মিলনে ভবিষ্যতের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা হতে চলেছে আরও ব্যাপক, সাশ্রয়ী ও সবসময় সক্রিয়।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

Leave a Reply