শিশুদের হার্টের ছিদ্র ভালো হয় কিনা
শিশুদের জন্মগত হৃদরোগের মধ্যে অন্যতম একটি সমস্যা হলো হার্টে ছিদ্র থাকা বা যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Septal Defect। অনেক বাবা-মা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান যখন তারা জানতে পারেন—তাদের শিশুর হার্টে একটি ছিদ্র রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব হার্টের ছিদ্রই সমান ঝুঁকিপূর্ণ নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই সময়ের সাথে সাথে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যেতে পারে।
এই প্রতিবেদনটিতে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব—হার্টের ছিদ্র কি ভালো হয়? কবে সার্জারি দরকার পড়ে? এবং চিকিৎসার বিকল্প উপায় কী কী রয়েছে?
👶 হার্টের ছিদ্র শনাক্ত হওয়ার পর প্রথম করণীয়শিশু জন্মের পর যদি চিকিৎসকরা সন্দেহ করেন যে তার হার্টে ছিদ্র রয়েছে, তাহলে প্রথমেই করাতে হয় ইকোকার্ডিওগ্রাফি (Echocardiography) পরীক্ষা। এর মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায় ছিদ্রটি কোথায়, কী আকারের, এবং সেটা শিশুর স্বাস্থ্যের উপর কতটা প্রভাব ফেলছে।
⏳ অপেক্ষা করলেই কি ভালো হয়ে যায়?
সব ধরনের হার্টের ছিদ্রের চিকিৎসা একরকম নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়—
ছিদ্রটি খুব ছোট এবং সময়ের সাথে নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে শিশুকে সাধারণত ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
প্রতি নির্দিষ্ট সময় পর পর ইকোকার্ডিওগ্রাফি করে দেখা হয় ছিদ্রটি ছোট হচ্ছে কি না।
যদি ছিদ্রটি বন্ধ হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তাহলে অপারেশনের দরকার পড়ে না। কিন্তু যদি ছিদ্র বড় হয় কিংবা সময়ের সঙ্গে বড় হতে থাকে, তখন চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
🛠 কখন সার্জারির প্রয়োজন হয়?
যেসব ক্ষেত্রে ছিদ্রটি ছোট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, অথবা সেটা শিশুতে উপসর্গ তৈরি করছে (যেমন: ঘন ঘন শ্বাসকষ্ট, ওজন না বাড়া, খাওয়াতে সমস্যা), তখন চিকিৎসকেরা অপারেশনের কথা বলেন।
তবে সার্জারির পাশাপাশি এখন আধুনিক পদ্ধতিতে ডিভাইস ক্লোজার (Device Closure) নামক একটি পদ্ধতি রয়েছে, যেখানে এনজিওগ্রামের মাধ্যমে হার্টে একটি বিশেষ ডিভাইস বসিয়ে ছিদ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি খোলা অস্ত্রোপচার নয়, এবং অনেক নিরাপদ ও স্বল্প সময়ে সম্পন্নযোগ্য।
😷 প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও ধরা পড়ে
অনেক মানুষই জন্মগতভাবে হার্টের ছিদ্র নিয়ে বড় হন, কিন্তু কোনো উপসর্গ না থাকায় সেটা অজানাই থেকে যায়। কখনো কখনো ৪০, ৫০ বা ৬০ বছর বয়সে ইকোকার্ডিওগ্রাফি করতে গিয়ে দেখা যায়—তার হার্টে ছিদ্র রয়েছে।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে যদি ছিদ্রটি সক্রিয় থাকে এবং হার্টের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে, তাহলে ডিভাইস ক্লোজার অথবা অপারেশনের মাধ্যমে ছিদ্র বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
🌬 ফুসফুসের জটিলতা হলে কী হয়?
হার্টে ছিদ্র থাকলে অনেক সময় রক্তের অতিরিক্ত চাপ ফুসফুসে গিয়ে পড়ে। এর ফলে ফুসফুসে উচ্চ রক্তচাপ বা পালমোনারি হাইপারটেনশন দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে হার্টের ছিদ্র বন্ধ করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
এমন রোগীরা যদি খুব দেরিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, তখন আর সার্জারি সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে ওষুধের মাধ্যমেই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, এবং রোগীকে আজীবন ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়।
হার্টের ছিদ্র একটি গুরুতর সমস্যা হলেও, সবসময় এটি ভয় পাওয়ার মতো নয়।
অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই এটি সময়ের সাথে ভালো হয়ে যায়।
কিন্তু নিয়মিত ফলোআপ এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার শিশুর যদি হার্টের ছিদ্র ধরা পড়ে, তাহলে দুশ্চিন্তা না করে একজন শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন এবং তার দেওয়া চিকিৎসা পরিকল্পনা মেনে চলুন।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

Leave a Reply