অনেকদিন চেষ্টার পরেও বাচ্চা হচ্ছে না? কী করবেন?
বিয়ের পর দীর্ঘদিন ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু গর্ভধারণ হচ্ছে না? এমন পরিস্থিতিতে অনেক দম্পতিই দুশ্চিন্তায় পড়েন। কেউ কেউ মনে করেন, সমস্যাটি হয়তো শুধু স্ত্রীর। আবার অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি করেন। তবে গর্ভধারণে দেরি হওয়ার পেছনে নারী ও পুরুষ, উভয়েরই বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
সাধারণত নিয়মিত, অসুরক্ষিত সহবাসের পরও ১২ মাসের মধ্যে গর্ভধারণ না হলে বন্ধ্যত্বের মূল্যায়ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে নারীর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে ৬ মাস চেষ্টা করার পরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বয়স ৪০ বছরের বেশি হলে আরও আগে মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই একসঙ্গে মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গর্ভধারণে সমস্যা শুধু নারীর নয়, পুরুষের কারণেও হতে পারে, আবার উভয়ের ক্ষেত্রেই কিছু সমস্যা থাকতে পারে।
বন্ধ্যত্ব নির্ণয়ে প্রথমেই প্রয়োজন সঠিক ইতিহাস
বন্ধ্যত্বের কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক প্রথমে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই বিস্তারিত শারীরিক ও প্রজননস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ইতিহাস নেন। কারণ, এই তথ্যগুলো থেকেই অনেক সময় সম্ভাব্য সমস্যার ধারণা পাওয়া যায়।
নারীর যেসব বিষয় মূল্যায়ন করা হয়
নারীর বয়স, মাসিকের ধরন ও নিয়মিততা, আগে কখনো গর্ভধারণ হয়েছে কি না, পূর্ববর্তী গর্ভধারণের ইতিহাস এবং কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে কি না, এসব বিষয় জানা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচার, যক্ষ্মার ইতিহাস, বর্তমানে কোনো ওষুধ সেবন করছেন কি না এবং সহবাসের সময় কোনো সমস্যা হয় কি না, সেসব বিষয়ও চিকিৎসক জানতে চান।
পুরুষের ইতিহাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ
পুরুষের বয়স, সহবাসের নিয়মিততা, যৌনজীবনে কোনো সমস্যা আছে কি না, পূর্ববর্তী কোনো অস্ত্রোপচার বা রোগের ইতিহাস রয়েছে কি না, সেসব বিষয় মূল্যায়ন করা হয়।
কিছু ক্ষেত্রে ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা ইজাকুলেশনের সমস্যা গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে নারীর ক্ষেত্রে ভ্যাজাইনিসমাস বা সহবাসে ব্যথার মতো সমস্যাও মূল্যায়ন করা জরুরি।
বন্ধ্যত্ব নির্ণয়ে কী কী পরীক্ষা করা হয়?
স্বামী-স্ত্রীর ইতিহাস নেওয়ার পর চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু প্রাথমিক পরীক্ষা করতে পারেন। নারী ও পুরুষ উভয়েরই পরীক্ষা একই সময়ে শুরু করা যেতে পারে।
১. পুরুষের সিমেন অ্যানালাইসিস
পুরুষের বন্ধ্যত্ব মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো সিমেন অ্যানালাইসিস বা বীর্য পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে বীর্যের পরিমাণ, শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা ও গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
প্রাথমিক মূল্যায়নে এই পরীক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলাফল অস্বাভাবিক হলে চিকিৎসক প্রয়োজনে পুনরায় পরীক্ষা বা আরও মূল্যায়নের পরামর্শ দিতে পারেন।
২. নারীর ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসোনোগ্রাফি
নারীর জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের অবস্থা মূল্যায়নের জন্য ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করা হতে পারে। এর মাধ্যমে জরায়ুতে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না, ডিম্বাশয়ের অবস্থা কেমন, কিংবা ফাইব্রয়েড বা সিস্টের মতো সমস্যা রয়েছে কি না, তা দেখা যায়।
৩. নারীর হরমোন পরীক্ষা
নারীর মাসিক ও ডিম্বস্ফোটনের অবস্থা মূল্যায়নে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন হরমোন পরীক্ষা করা হয়। যেমন, থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH), প্রোল্যাকটিন, FSH, LH, ইস্ট্রাডিওল এবং AMH।
কিছু হরমোনের পরীক্ষা মাসিক চক্রের নির্দিষ্ট দিনে করা হয়। কোন পরীক্ষা কখন করা হবে, তা চিকিৎসক রোগীর মাসিকের ধরন ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে নির্ধারণ করেন।
৪. ডায়াবেটিস ও সংক্রমণ মূল্যায়ন
প্রয়োজনে নারী ও পুরুষ উভয়ের ডায়াবেটিস এবং নির্দিষ্ট সংক্রমণের ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা হয়। রোগীর ইতিহাস ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক প্রাসঙ্গিক পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।
এ ছাড়া গর্ভধারণে সমস্যা হলে জরায়ুর গঠন ও ফ্যালোপিয়ান টিউব খোলা আছে কি না, সেটিও মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।
পরীক্ষায় সমস্যা ধরা পড়লে কী হবে?
প্রাথমিক পরীক্ষায় কোনো সমস্যা শনাক্ত হলে চিকিৎসক প্রথমে সেই সমস্যার উপযুক্ত চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপনা শুরু করেন। যেমন, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের সমস্যা কিংবা অন্য কোনো চিকিৎসাযোগ্য রোগ থাকলে সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এরপর দম্পতির বয়স, পরীক্ষার ফলাফল, বন্ধ্যত্বের সময়কাল ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। প্রয়োজনে গর্ভধারণের আগে কিছু ওষুধ বা প্রি-কনসেপশন কেয়ারের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
শেষ কথা
দীর্ঘদিন চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণ না হলে দুশ্চিন্তায় না থেকে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বন্ধ্যত্বের কারণ নির্ণয়ে দুজনের ইতিহাস ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমস্যার কারণ শনাক্ত করা গেলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সম্ভব। তাই একে অপরকে দোষারোপ না করে একসঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

Leave a Reply