বন্ধ্যাত্বের কারণ নির্ণয়ের জন্য যেসব পরীক্ষা জরুরি
বন্ধ্যাত্ব এখন একটি সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত সংবেদনশীল সমস্যা। অনেক দম্পতি জানেন না যে প্রাথমিক পর্যায়ে কোন পরীক্ষাগুলো করলে সঠিকভাবে কারণ নির্ণয় করা যায়। ভুল পরীক্ষার কারণে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি অনেক সময় চিকিৎসার সঠিক দিকও নির্ধারণ করা যায় না। আজকের এই লেখায় আমরা জানবো—বন্ধ্যাত্বের সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য পুরুষ ও নারীদের কী কী বেসিক পরীক্ষা করা উচিত এবং কখন অতিরিক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন হয়।
পুরুষের ক্ষেত্রে কোন পরীক্ষা করতে হবে?
পুরুষ বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের জন্য মূলত একটি মাত্র বেসিক পরীক্ষা আছে:
✔ সিমেন এনালাইসিস (Semen Analysis)
এটি বীর্যের গুণগত ও পরিমাণগত বিশ্লেষণ।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই বোঝা যায়—
-
শুক্রাণুর সংখ্যা ঠিক আছে কিনা
-
শুক্রাণুর গতি কেমন
-
স্বাভাবিক আকারের শুক্রাণুর পরিমাণ কত
একটি সিমেন এনালাইসিসই পুরুষ বন্ধ্যাত্বের প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য যথেষ্ট।
মহিলাদের ক্ষেত্রে যে পরীক্ষাগুলো জরুরি
নারীদের জন্য বন্ধ্যাত্বের বিষয়ে বেসিক স্ক্রিনিং কিছুটা বিস্তৃত। প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়।
✔ ১. ট্রান্সভ্যাজাইনাল আল্ট্রাসনোগ্রাফি (TVS)
মাসিকের রাস্তা দিয়ে করা এই আল্ট্রাসনোতে দেখা যায়—
-
ডিম্বাশয়ের অবস্থা
-
জরায়ুর গঠন
-
কোনো সিস্ট, ফাইব্রয়েড, পলিপ আছে কিনা
-
ডিম্বাণুর স্টক কতটা আছে (অ্যান্ট্রাল ফলিকল কাউন্ট)
বন্ধ্যাত্ব নির্ণয়ের একেবারে প্রথম ধাপেই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
✔ ২. হরমোন টেস্ট
যাদের মাসিক অনিয়মিত বা হরমোনজনিত সমস্যা আছে তাদের ক্ষেত্রে নিচের হরমোনগুলো পরীক্ষা করা হয়:
-
FSH (Follicle Stimulating Hormone)
-
LH (Luteinizing Hormone)
-
TSH (Thyroid Stimulating Hormone)
-
Prolactin (অনেক সময় যোগ হয়)
থাইরয়েড বা প্রোল্যাক্টিনের সমস্যা থাকলে ডিম্বস্ফোটন ব্যাহত হয়, ফলে গর্ভধারণে সমস্যা দেখা দেয়।
✔ ৩. সাধারণ শারীরিক স্ক্রিনিং টেস্ট
-
CBC (Complete Blood Count)
-
ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং (Fasting glucose / OGTT)
-
রক্তের গ্রুপ
-
ইনফেকশন স্ক্রিনিং
-
HBsAg (Hepatitis B)
-
Anti-HCV (Hepatitis C)
-
HIV test
-
সংক্রমণ বা মেটাবলিক রোগ থাকলে গর্ভধারণের উপর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
টিউব ব্লক আছে কিনা—কখন পরীক্ষা করবেন?
অনেক দম্পতির মনে প্রশ্ন থাকে—টিউবের পরীক্ষা কি প্রথমেই করতে হবে?
যখনই টিউব পরীক্ষা করা উচিত নয়:
শুরুতেই নয়।
প্রথমে ২–৩ মাস হরমোন ব্যালেন্স ও ডিম বড় করার ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়।
যদি তাতেও ফল না আসে, তখন টিউব টেস্ট করা হয়।
যেসব ক্ষেত্রে আগে টিউব দেখা জরুরি:
-
আগে গর্ভধারণ হয়েছিল কিন্তু এখন দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে না
-
আগে পেটের বড় অপারেশন হয়েছিল
-
টিউব ব্লকের সন্দেহ থাকে
-
প্রচণ্ড পিরিয়ড ব্যথা বা এন্ডোমেট্রিওসিসের ইতিহাস থাকে
টিউব পরীক্ষা করার পদ্ধতি
✔ HSG (Hysterosalpingogram)
একটি এক্স–রে টেস্ট। একটু ব্যথা হয়, জটিলতা আছে, তবে টিউব ব্লক নির্ণয়ে প্রচলিত পদ্ধতি।
✔ SIS / SSG (Saline Infusion Sonography)
আল্ট্রাসাউন্ডের সময় স্যালাইন দিয়ে টিউব দেখা হয়।
-
ব্যথা কম
-
সহজ
-
দ্রুত
এটি এখন টিউব পরীক্ষার আধুনিক ও কম কষ্টদায়ক পদ্ধতি।
ওভারিয়ান রিজার্ভ টেস্ট: AMH
বিশেষ করে ৩০–৩৫ বছরের পর নারীদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা:
✔ AMH (Anti-Mullerian Hormone)
এই রিপোর্ট দেখলে বোঝা যায় মহিলার ওভারিয়ান রিজার্ভ কতটা আছে অর্থাৎ
তার ডিম্বাণুর সংখ্যা স্বাভাবিক আছে কিনা।
বর্তমানে অনেক নারীর AMH স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত কমে যাচ্ছে।
AMH কমে গেলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়, তাই দেরি না করে দ্রুত পরীক্ষা করা জরুরি।
সব পরীক্ষা একবারেই করতে হবে কি?
না। এটি একটি ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া।
-
প্রথমে বেসিক টেস্ট
-
তারপর চিকিৎসা
-
চিকিৎসায় সাড়া না পেলে উন্নত পরীক্ষা
-
অতিরিক্ত জটিল সমস্যা থাকলে রোগীকে টারশিয়ারি স্পেশালাইজড সেন্টারে রেফার করা
সব পরীক্ষা একসাথে করলে অ unnecessary খরচ বাড়ে, আবার পরীক্ষা না করলে সঠিক চিকিৎসায় দেরি হয়।
সবশেষে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
-
বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা সময়সাপেক্ষ
-
নিয়মিত মনিটরিং না করলে চিকিৎসার ফল পাওয়া কঠিন
-
টিভিএস মনিটরিং ছাড়া শুধু ওষুধ খেলে সঠিক ডিম্বস্ফোটন হচ্ছে কিনা বোঝা যায় না
-
রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক ঠিক করবেন কোন দম্পতিকে কোথায় রেফার করতে হবে
সঠিক পরীক্ষা, সঠিক সময়ে, সঠিক চিকিৎসা—এটাই বন্ধ্যাত্ব নিরাময়ের মূল চাবিকাঠি।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

Leave a Reply