PCOS থাকলে গর্ভধারণে কী প্রভাব পড়ে
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা PCOS একটি হরমোনজনিত সমস্যা, যা বর্তমানে বাংলাদেশের বহু নারীর মধ্যে দেখা যাচ্ছে। এটি কোনো সংক্রামক রোগ নয়, বরং শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফলে তৈরি হওয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা। বিশেষ করে প্রজনন বয়সী নারীদের মধ্যে PCOS বেশি লক্ষ্য করা যায় এবং গর্ভধারণের ক্ষেত্রে এটি কিছুটা জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে সঠিক চিকিৎসা, জীবনযাপনের পরিবর্তন এবং নিয়মিত ফলোআপের মাধ্যমে PCOS থাকা সত্ত্বেও সুস্থভাবে গর্ভধারণ সম্ভব।
PCOS আক্রান্ত নারীদের মধ্যে কিছু সাধারণ লক্ষণ প্রায়ই দেখা যায়। তাদের অধিকাংশই অতিরিক্ত ওজন বা ওভারওয়েট সমস্যায় ভোগেন। মুখে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে অবাঞ্ছিত লোম গজানো, ত্বকে ব্রণ হওয়া, চুল পড়া, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, কাজের প্রতি অনীহা এবং অতিরিক্ত ঘুমানোর প্রবণতা এই রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত লক্ষণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাসিক বা পিরিয়ডের অনিয়ম। অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পিরিয়ড না হওয়া, খুব দেরিতে হওয়া বা অনিয়মিতভাবে হওয়া PCOS-এর একটি প্রধান উপসর্গ।
গর্ভধারণের জন্য নিয়মিত ডিম্বস্ফোটন বা ওভুলেশন অত্যন্ত জরুরি। PCOS-এর ক্ষেত্রে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে ডিম্বস্ফোটন নিয়মিত হয় না। ফলে ডিম্বাণু নির্দিষ্ট সময়ে বের না হলে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণে সমস্যা দেখা দেয়। এই কারণেই PCOS আক্রান্ত নারীদের মধ্যে সন্তান ধারণে বিলম্ব হতে পারে। তবে এটি কখনোই এমন নয় যে PCOS থাকলেই গর্ভধারণ অসম্ভব।
PCOS ব্যবস্থাপনার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো জীবনযাত্রার পরিবর্তন। অতিরিক্ত ওজন PCOS-এর উপসর্গগুলোকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত জরুরি। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত চিনি ও ফাস্টফুড এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত ঘুম PCOS নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শুধু ওজন কমানো এবং জীবনযাত্রা ঠিক করার মাধ্যমে পিরিয়ড অনেকটাই নিয়মিত হয়ে আসে।
এর পাশাপাশি অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোনাল পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করে রোগের অবস্থা নির্ণয় করেন। তারপর পিরিয়ড নিয়মিত করার জন্য ওষুধ, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে তার চিকিৎসা এবং ডিম্বস্ফোটন স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গর্ভধারণ সম্ভব হয়।
PCOS আক্রান্ত নারীরা গর্ভধারণ করতে পারলে তখনও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গর্ভধারণের পর কিছু ক্ষেত্রে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা গর্ভপাতের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকতে পারে। তাই নিয়মিত চেকআপ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা বাধ্যতামূলক। এতে মা ও শিশুর উভয়ের সুস্থতা নিশ্চিত করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, PCOS একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য হরমোনজনিত সমস্যা। সচেতনতা, সঠিক চিকিৎসা এবং জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে PCOS থাকা সত্ত্বেও সুস্থ ও স্বাভাবিক গর্ভধারণ সম্ভব। সময়মতো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং ধৈর্য ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

Leave a Reply