অতিরিক্ত হাত-পা ঘামানোর স্থায়ী সমাধান: কী এই ETS সার্জারি?
অতিরিক্ত হাত-পা ঘামানোর স্থায়ী সমাধান: কী এই ETS সার্জারি?
অনেকেরই কোনো কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত হাত ও পা ঘামার সমস্যা থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্লামোপ্লান্টার হাইপারহাইড্রোসিস (Palmoplantar Hyperhidrosis)। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ঘামেন। পরীক্ষা দিতে গেলে খাতা ভিজে যাওয়া, কারও সাথে হ্যান্ডশেক করতে সংকোচ বোধ করা, টাচস্ক্রিন মোবাইল ব্যবহারে সমস্যা কিংবা জুতো পরলে পা পিছলে যাওয়ার মতো নানা সামাজিক ও মানসিক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় তাদের।
লোশন, পাউডার বা বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করেও যখন এই সমস্যার সমাধান হয় না, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর একমাত্র এবং স্থায়ী সমাধান হিসেবে আসে ETS সার্জারি।
ETS সার্জারি কী? (What is ETS Surgery?)
ETS-এর পূর্ণরূপ হলো Endoscopic Thoracic Sympathectomy (এন্ডোস্কোপিক থোরাসিক সিমপ্যাথেকটমি)। এটি একটি অত্যন্ত আধুনিক এবং মিনিমালি ইনভেসিভ (ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে) সার্জারি।
আমাদের শরীরে ঘাম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ‘সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ বা এক ধরণের স্নায়ুতন্ত্র দায়ী থাকে। হাইপারহাইড্রোসিসের রোগীদের ক্ষেত্রে এই স্নায়ুগুলো অতিরিক্ত মাত্রায় সক্রিয় বা ওভারঅ্যাক্টিভ হয়ে পড়ে, যার ফলে হাত-পায়ে অনবরত ঘাম হতে থাকে। ETS সার্জারির মাধ্যমে বুক বা বগলের নিচে সামান্য ছিদ্র করে এন্ডোস্কোপিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে সেই অতিরিক্ত সক্রিয় স্নায়ু বা নার্ভ সিগন্যালটিকে কেটে বা ক্লিপ দিয়ে ব্লক করে দেওয়া হয়।
কেন এটি হাত-পা ঘামার স্থায়ী সমাধান?
-
শতভাগ কার্যকারিতা: হাত ঘামার সমস্যার ক্ষেত্রে এই সার্জারির সাফল্যের হার প্রায় ৯৮% থেকে ৯৯%। অপারেশনের টেবিল থেকে ওঠার সাথে সাথেই রোগীর হাত ঘামা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
-
ছোট ছিদ্র, কোনো বড় দাগ নেই: এটি কোনো ওপেন সার্জারি নয়। বগলের নিচে মাত্র একটি বা দুটি ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে এটি করা হয়, যার ফলে শরীরে কোনো বড় কাটার দাগ থাকে না।
-
দ্রুত রিকভারি: অপারেশনের পর রোগীকে খুব বেশিদিন হাসপাতালে থাকতে হয় না। সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই রোগী বাসায় ফিরে যেতে পারেন এবং অল্প দিনেই স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু করতে পারেন।
সার্জারির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক (পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া)
যেকোনো সার্জারির মতোই ETS-এর ক্ষেত্রেও একটি সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা সাইড ইফেক্ট রয়েছে, যা অপারেশনের আগে জেনে নেওয়া জরুরি:
-
কমপেনসেটরি সোয়েটিং (Compensatory Sweating): হাত ও বগলের ঘাম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য ঘাম অন্য কোনো রুট দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে অপারেশনের পর পিঠ, পেট বা ঊরুর দিকে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি ঘাম হতে পারে। তবে এটি একেক জনের শরীরে একেক রকম প্রভাব ফেলে।
কখন এই সার্জারিটি করানো উচিত?
চিকিৎসকদের মতে, হাত-পা ঘামার সমস্যা যদি মৃদু বা মাঝারি হয়, তবে শুরুতেই সার্জারির প্রয়োজন নেই। সে ক্ষেত্রে অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইডযুক্ত মলম, আয়নটোফোরেসিস (Iontophoresis) থেরাপি বা বোটক্স ইনজেকশনের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু এই পদ্ধতিগুলো সাময়িক এবং এগুলো করার পরেও যদি কোনো কাজ না হয় এবং সমস্যাটি আপনার পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করে, তবেই স্থায়ী মুক্তির জন্য ETS সার্জারি সেরা বিকল্প।
শেষ কথা: অতিরিক্ত হাত-পা ঘামানো কোনো লজ্জার বিষয় নয়, এটি একটি শারীরিক ব্যাধি। লোকমুখে শুনে ভুল চিকিৎসা না করে, এই আধুনিক যুগে সরাসরি একজন থোরাসিক সার্জন (Thoracic Surgeon) বা নিউরো সার্জনের পরামর্শ নিন। সঠিক সময়ে ETS সার্জারির মাধ্যমে এই বিব্রতকর সমস্যা থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

Leave a Reply