কোমর ব্যথা বা PLID হলেই কি অপারেশন?
না। কোমর ব্যথা বা PLID ধরা পড়লেই অপারেশন লাগে না। অধিকাংশ রোগী অপারেশন ছাড়াই ওষুধ, ব্যায়াম ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে সুস্থ হয়ে ওঠেন। অপারেশন দরকার হয় শুধু নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে।
PLID কী?
PLID-এর পূর্ণরূপ Prolapsed Lumbar Intervertebral Disc। মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর মাঝখানে নরম ডিস্ক থাকে, যা শক অ্যাবজর্বারের মতো কাজ করে। কোমরের অংশে এই ডিস্ক তার জায়গা থেকে সরে গেলে বা বেরিয়ে এলে তাকে PLID বলে। সরে যাওয়া ডিস্ক আশপাশের স্নায়ুতে চাপ দিলে কোমরে ব্যথা হয়, যা অনেক সময় নিতম্ব ও পা বেয়ে নিচে নেমে যায়। এর সঙ্গে পায়ে ঝিনঝিন বা অবশ ভাবও থাকতে পারে।
MRI-তে ডিস্ক সরা দেখা গেলেই কি চিন্তার কিছু আছে?
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনেক মানুষের MRI-তে ডিস্ক সরে থাকা বা ফুলে থাকা দেখা যায়, অথচ তাদের কোনো ব্যথাই থাকে না। তাই শুধু রিপোর্ট দেখে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং MRI, এই তিনটি মিলিয়ে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
অপারেশন ছাড়া চিকিৎসা
চিকিৎসকেরা সাধারণত প্রথমে অপারেশন ছাড়া চিকিৎসা দিয়ে শুরু করেন। অনেক ক্ষেত্রে ৬ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে ব্যথা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কারণ সরে যাওয়া ডিস্কের অংশ সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই ছোট হয়ে আসতে পারে।
১. ওষুধ: ব্যথা ও প্রদাহ কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ দেওয়া হয়। স্নায়ুর ব্যথার জন্য আলাদা ওষুধও থাকে।
২. ফিজিওথেরাপি: সঠিক ব্যায়াম ও থেরাপি ব্যথা কমায় এবং পেটের ও পিঠের পেশি শক্ত করে, যা মেরুদণ্ডকে সাপোর্ট দেয়।
৩. জীবনযাত্রার পরিবর্তন: ভারী জিনিস তোলা ও সামনে ঝুঁকে কাজ করা কমানো, সোজা হয়ে বসা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ধূমপান বাদ দেওয়া।
৪. সক্রিয় থাকা: আগে মনে করা হতো ব্যথা হলে দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে। এখন বলা হয়, এক-দুই দিনের বেশি পুরো বিশ্রাম নয়। ব্যথা সহনীয় সীমার মধ্যে হালকা হাঁটাচলা করলে দ্রুত সেরে ওঠা যায়।
৫. ইনজেকশন: ব্যথা তীব্র থাকলে এবং ওষুধে না কমলে স্নায়ুর আশপাশে স্টেরয়েড ইনজেকশন (এপিডুরাল ইনজেকশন) দেওয়ার কথা ভাবা হতে পারে। এটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করাতে হয়।
৬. গরম বা ঠান্ডা সেঁক: ব্যথার শুরুতে আরাম পেতে সহায়ক হতে পারে।
কখন অপারেশনের কথা ভাবা হয়?
জরুরি অবস্থা (দেরি না করে হাসপাতালে যান):
- প্রস্রাব বা পায়খানার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা
- প্রস্রাব আটকে যাওয়া
- দুই উরুর মাঝখানে বা পায়ুপথের আশপাশে অসাড় ভাব
- দুই পায়ে হঠাৎ দুর্বলতা
এগুলো কডা ইকুইনা সিনড্রোমের লক্ষণ হতে পারে। এটি একটি জরুরি অবস্থা, যাতে দ্রুত অপারেশন না করলে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
অন্যান্য ক্ষেত্রে:
- পায়ের দুর্বলতা ক্রমশ বাড়তে থাকলে, যেমন পায়ের পাতা তুলতে না পারা
- ৬ থেকে ১২ সপ্তাহ সঠিক চিকিৎসার পরও তীব্র পায়ের ব্যথা থেকে গেলে এবং দৈনন্দিন কাজ বা ঘুম ব্যাহত হলে
- ব্যথা এত তীব্র যে ওষুধেও সামলানো যাচ্ছে না
কী ধরনের অপারেশন হয়?
আধুনিক সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই বড় কাটাছেঁড়া ছাড়া ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে অপারেশন করা সম্ভব। এর মধ্যে মাইক্রোডিসকেকটমি ও এন্ডোস্কোপিক ডিসকেকটমি বহুল প্রচলিত। এতে সরে যাওয়া ডিস্কের যে অংশ স্নায়ুতে চাপ দিচ্ছে সেটুকু সরিয়ে ফেলা হয়। কিছু জটিল ক্ষেত্রে অন্য ধরনের অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে, যা চিকিৎসক রোগীর অবস্থা দেখে ঠিক করেন। অপারেশনেরও কিছু ঝুঁকি থাকে, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা জরুরি।
অপারেশনের পরও সতর্ক থাকতে হবে
অপারেশন হলেই সব সমস্যা চিরতরে শেষ হয়ে যায় না। পরে আবার একই বা অন্য জায়গায় সমস্যা হতে পারে। তাই অপারেশনের পর এবং অপারেশন ছাড়া সুস্থ হওয়ার পরও কোমরের ব্যায়াম, সঠিক ভঙ্গি ও ওজন নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে যেতে হয়।
শেষ কথা
কোমর ব্যথা বা PLID মানেই অপারেশন নয়। বেশিরভাগ রোগী ওষুধ, ফিজিওথেরাপি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনেই ভালো হয়ে যান। শুধু MRI রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ভয় পাওয়া বা তাড়াহুড়ো করে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। তবে প্রস্রাব-পায়খানায় সমস্যা বা পায়ে ক্রমবর্ধমান দুর্বলতা দেখা দিলে একেবারেই দেরি করা যাবে না।
এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

Leave a Reply