চিকিৎসকের কলমে, সুস্থতার সন্ধানে আমাদের চিকিৎসক প্রতিকার সম্পর্কে

বিষয়, লেখার শিরোনাম অথবা চিকিৎসকের নাম

লেখাটি সহজ বাংলায় লিখুন, তথ্যের সূত্র উল্লেখ করুন এবং রোগীর ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রাখুন।

লেখা জমা দেওয়ার নিয়ম ও ফর্ম
ডাক্তারের পরামর্শ

জন্মের পর বাচ্চার পা বাঁকা নিয়ে চিন্তিত?

Protikar১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ · ৭ মিনিট পড়া

নবজাতক বা ছোট শিশুর পা বাঁকা দেখলে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি স্বাভাবিক বৃদ্ধির একটি ধাপ, যা শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য চিকিৎসকের সাহায্য লাগে। তাই কোনটা স্বাভাবিক আর কোনটা নয়, তা জানা জরুরি।

“পা বাঁকা” বলতে কী বোঝায়?

সাধারণত তিন ধরনের সমস্যাকে মানুষ “পা বাঁকা” বলে:

  1. হাঁটু থেকে পা ধনুকের মতো বাইরের দিকে বাঁকা: দাঁড়ালে দুই গোড়ালি জোড়া লাগালেও হাঁটুর মাঝে ফাঁক থাকে।
  2. পায়ের পাতা ভেতরের দিকে বাঁকা বা ঘোরানো: এটি ক্লাবফুট বা পায়ের পাতার অন্য কোনো সমস্যা হতে পারে।
  3. হাঁটার সময় পায়ের পাতা ভেতরের দিকে ঘুরে থাকা: একে ইন-টোয়িং বলে। ছোট শিশুদের মধ্যে এটি বেশ সাধারণ।

ধনুকের মতো বাঁকা পা: বেশিরভাগ সময় স্বাভাবিক

মায়ের গর্ভে শিশু গুটিসুটি মেরে থাকে। এতে তার পা কিছুটা ভেতরের দিকে ভাঁজ হয়ে থাকে, তাই জন্মের সময় পা একটু বাঁকা দেখায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ফিজিওলজিক্যাল বাউ লেগ বলে। এটি রোগ নয়।

শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে পায়ের আকৃতি সাধারণত এভাবে বদলায়:

  • জন্ম থেকে ২ বছর: পা কিছুটা ধনুকের মতো বাঁকা থাকে। ১ থেকে ১.৫ বছর বয়সে এটি একটু বেশি চোখে পড়তে পারে।
  • ১.৫ থেকে ২ বছর: পা ধীরে ধীরে সোজা হতে শুরু করে।
  • ৩ থেকে ৪ বছর: অনেক শিশুর পা এবার উল্টো দিকে বেঁকে যায়, অর্থাৎ হাঁটু কাছাকাছি আসে আর গোড়ালির মাঝে ফাঁক থাকে (নক-নি)। এটিও স্বাভাবিক।
  • ৭ থেকে ৮ বছর: বেশিরভাগ শিশুর পা স্বাভাবিকভাবে সোজা হয়ে যায়।

স্বাভাবিক বাঁকা পায়ের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে:

  • দুই পা প্রায় সমানভাবে বাঁকা থাকে।
  • বাঁকা ভাব সামান্য থাকে।
  • শিশু স্বাভাবিকভাবে খেলে, হাঁটে ও বেড়ে ওঠে।
  • সময়ের সঙ্গে বাঁকা ভাব কমতে থাকে।

কখন বিষয়টি স্বাভাবিক নয়?

নিচের লক্ষণগুলো থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত:

  • এক পা অন্য পায়ের চেয়ে বেশি বাঁকা
  • বাঁকা ভাব অনেক বেশি বা সময়ের সঙ্গে বাড়ছে
  • ২ বছর পার হওয়ার পরও পা সোজা হচ্ছে না, বরং বাঁকা থাকছে বা বাড়ছে
  • শিশুর উচ্চতা বয়সের তুলনায় অনেক কম
  • পরিবারে হাড়ের সমস্যার ইতিহাস আছে
  • হাঁটতে দেরি হচ্ছে বা খুঁড়িয়ে হাঁটছে
  • শিশুর ওজন বেশি এবং খুব আগে হাঁটতে শুরু করেছে

রিকেটস বা ভিটামিন ডি-র ঘাটতি

ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের অভাবে হাড় নরম হয়ে গিয়ে পা বেঁকে যেতে পারে, যাকে রিকেটস বলে। আমাদের দেশে এ সমস্যা একেবারে বিরল নয়। রিকেটসের সঙ্গে এসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে:

  • মাথার তালু (ফন্টানেল) দেরিতে বন্ধ হওয়া
  • কব্জি ও হাঁটুর জোড়া মোটা দেখানো
  • বুকের পাঁজরে গুটির মতো উঁচু ভাব
  • দাঁত উঠতে দেরি হওয়া
  • বসতে বা হাঁটতে দেরি হওয়া

এমন লক্ষণ থাকলে রক্ত পরীক্ষা ও এক্স-রে করে নিশ্চিত হতে হয়। রিকেটস শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামে ভালো ফল পাওয়া যায়।

ব্লাউন্ট’স ডিজিজ

এটি হাঁটুর নিচের হাড়ের বৃদ্ধির একটি সমস্যা। ২ বছরের পর পা ক্রমশ বেশি বাঁকা হতে থাকলে, বিশেষ করে এক পায়ে, এ রোগের সম্ভাবনা থাকে। এতে এক্স-রে করা লাগে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রেস বা অপারেশনের প্রয়োজন হয়।

পায়ের পাতা বাঁকা হলে: ক্লাবফুট

কিছু শিশু জন্মের সময় পায়ের পাতা ভেতরের দিকে ঘোরানো ও নিচের দিকে বাঁকানো অবস্থায় নিয়ে জন্মায়। পায়ের তলা ভেতরের দিকে মুখ করে থাকে। একে জন্মগত ক্লাবফুট (CTEV) বলে, যা প্রতি হাজারে একটি বা দুটি শিশুর হয়। কখনো এক পায়ে, কখনো দুই পায়ে।

  • এ ক্ষেত্রে পা হাত দিয়ে ধীরে সোজা করার চেষ্টা করলেও স্বাভাবিক অবস্থানে আনা যায় না।
  • জন্মের সময়ই এটি চোখে পড়ে, অনেক সময় গর্ভাবস্থার আল্ট্রাসাউন্ডেও ধরা পড়ে।
  • চিকিৎসা না করালে শিশু বড় হয়ে পায়ের পাতার পাশের অংশের ওপর ভর দিয়ে হাঁটে, যা হাঁটাচলায় বড় সমস্যা করে।

সুখবর হলো, এর চিকিৎসা খুব কার্যকর। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি পনসেটি পদ্ধতি। এতে:

  • জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চিকিৎসা শুরু করা হয়।
  • প্রতি সপ্তাহে পা ধীরে ধীরে সোজা করে প্লাস্টার লাগানো হয়, সাধারণত কয়েক সপ্তাহ ধরে।
  • অনেক ক্ষেত্রে গোড়ালির টেন্ডনে একটি ছোট প্রক্রিয়া করা লাগে।
  • এরপর পা সোজা রাখতে বিশেষ জুতা ও বার (ব্রেস) পরাতে হয়। শুরুতে বেশিরভাগ সময়, পরে রাতে ও ঘুমের সময়, কয়েক বছর ধরে। ব্রেস নিয়মিত না পরালে পা আবার বেঁকে যেতে পারে, তাই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যত আগে শুরু করা যায়, ফল তত ভালো। তাই দেরি না করে শিশু অর্থোপেডিক সার্জন বা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান।

পায়ের পাতার অন্য কিছু সাধারণ সমস্যা

গর্ভে জায়গার অভাবে কিছু শিশুর পায়ের পাতা ভেতরে বেঁকে থাকে (মেটাটারসাস অ্যাডাক্টাস) বা ওপরের দিকে ভাঁজ হয়ে থাকে (ক্যালকেনিওভ্যালগাস)। এগুলো ক্লাবফুটের মতো কঠিন নয়। পায়ের পাতা হাতে ধীরে ঘোরালে স্বাভাবিক অবস্থানে আনা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো নিজে থেকে বা সামান্য স্ট্রেচিংয়ে ঠিক হয়ে যায়। তবে ক্লাবফুট থেকে আলাদা করতে চিকিৎসককে একবার দেখিয়ে নেওয়া ভালো। কীভাবে স্ট্রেচিং করাবেন তাও চিকিৎসক শিখিয়ে দেবেন।

ঘরে বাবা-মা যা করবেন

  • নিয়মিত শিশুকে চিকিৎসকের কাছে দেখান এবং গ্রোথ চার্টে উচ্চতা ও ওজন মাপান।
  • ৬ মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ দিন এবং এরপর ঘন ও পুষ্টিকর বাড়তি খাবার শুরু করুন। ডিম, মাছ, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।
  • ভিটামিন ডি ড্রপ দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত এটি পরামর্শ দেওয়া হয়।
  • রোদে সময় কাটান। শিশুকে সকালের নরম রোদে কিছু সময় রাখলে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরি হয়। তবে তীব্র রোদ এড়িয়ে চলুন।
  • শিশুকে স্বাভাবিকভাবে হামাগুড়ি দিতে, দাঁড়াতে ও হাঁটতে দিন। নড়াচড়া হাড় শক্ত হতে সাহায্য করে।
  • শিশুর পায়ের ছবি বা ভিডিও সময়ে সময়ে তুলে রাখুন। এতে বাঁকা ভাব কমছে না বাড়ছে, তা বোঝা সহজ হয় এবং চিকিৎসককে দেখানোও সুবিধা হয়।

যা করবেন না

  • পা সোজা করার জন্য কাপড় বা ব্যান্ডেজ দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখবেন না। এতে কোনো উপকার হয় না। উল্টো শিশুর কোমরের জোড়ায় (হিপ) সমস্যা হতে পারে।
  • জোরে টেনে বা মালিশ করে পা সোজা করার চেষ্টা করবেন না। এতে শিশুর কষ্ট হয় এবং ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বিশেষ জুতা, ব্রেস বা সাপোর্ট কিনে পরাবেন না। স্বাভাবিক বাঁকা পায়ে এসবের প্রয়োজন হয় না।
  • ভিটামিন ডি বা ক্যালসিয়ামের ওষুধ নিজে থেকে বেশি মাত্রায় দেবেন না। মাত্রা চিকিৎসক ঠিক করবেন।
  • ওঝা, কবিরাজ বা অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে নেবেন না। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না হলে ক্ষতি হতে পারে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন?

নিচের যেকোনো একটি থাকলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা অর্থোপেডিক চিকিৎসককে দেখান:

  • জন্মের সময়ই পায়ের পাতা ভেতরের দিকে বাঁকানো, যা হাতে সোজা করা যায় না
  • এক পা বেশি বাঁকা বা এক পা ছোট মনে হওয়া
  • উরুর ভাঁজ বা পায়ের ভাঁজ দুই পাশে সমান না থাকা
  • ২ বছর বয়সের পর পা আরও বেশি বাঁকা হচ্ছে
  • ৩ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও বাঁকা ভাব বেশি
  • শিশু খুঁড়িয়ে হাঁটছে বা হাঁটতে ব্যথা পাচ্ছে
  • রিকেটসের লক্ষণ, যেমন মাথার তালু দেরিতে বন্ধ হওয়া, হাত-পায়ের জোড়া মোটা দেখানো, হাঁটতে বা বসতে দেরি হওয়া
  • শিশুর উচ্চতা তার বয়সের তুলনায় খুব কম
  • পায়ের বাঁকা ভাব নিয়ে আপনার মনে প্রবল সন্দেহ বা উদ্বেগ আছে

শেষ কথা

জন্মের পর বা প্রথম দুই বছরে শিশুর দুই পা সমানভাবে সামান্য বাঁকা থাকা প্রায় সবসময়ই স্বাভাবিক, এবং শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে এটি নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। তবে পায়ের পাতা ভেতরে ঘোরানো (ক্লাবফুট), এক পা বেশি বাঁকা, ২ বছরের পর বাঁকা ভাব বেড়ে যাওয়া, কিংবা রিকেটসের লক্ষণ থাকলে দেরি করা উচিত নয়। সময়মতো ধরা পড়লে এসব সমস্যার বেশিরভাগই সফলভাবে চিকিৎসা করা যায়। সন্দেহ হলে আন্দাজে না থেকে একবার চিকিৎসককে দেখিয়ে নিলেই নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

এই লেখা সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *